বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান 🔵 Bible Quran and Science
ধর্মগ্রন্থের কোনো বক্তব্যকে বৈজ্ঞানিক সত্যের দিক থেকে গ্রহণযোগ্য কিংবা অগ্রহণযোগ্য বলে সাব্যস্ত করার আগে “বৈজ্ঞানিক সত্য” সম্পর্কে কিছু ব্যাখ্যা প্রদান জরুরি।
এ বিষয়ে একটি কথার উপর ড. মরিস বুকাইলি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
তিনি বলেন, “বৈজ্ঞানিক তথ্য-পরিসংখ্যান বলতে সেই সত্যকে বোঝাতে চেয়েছি যা বৈজ্ঞানি পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। এই বিবেচনায় ব্যাখ্যামূলক সেইসব থিওরি বা সিদ্ধান্ত বাদ দেয়া হয়েছে যেসব থিওরি একসময় কোনো প্রাকৃতিক বিষয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হত, কিন্তু বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে সেগুলোর উপযোগিতা হারিয়ে গেছে।”
এ কথার মাধ্যমে যা বলতে চাওয়া হচ্ছে, তা হলো, ড. বুকাইলি শুধু সেই বৈজ্ঞানিক সত্যকেই বিচারের মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করেছেন যা অখন্ডনীয় এবং অবিসম্বাদিতভাবেই সত্য। আর যেসব বিষয়ে বিজ্ঞান এ যাবত কিছু আংশিক বা অসম্পূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছে, সেসব ক্ষেত্রে শুধু ততোটুকু গ্রহণ করা হয়েছে যতোটুকু বৈজ্ঞানিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং যতোটুকুর ব্যবহারে ভুলের কোনো আশঙ্কা নেই।
এখানে একটি উদাহরণ তুলে ধরে ড. মরিস বুকাইলি বলেন,
“যদিও পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের কোনো সন-তারিখ বিজ্ঞানীদের হাতে নেই, তবু সুদূর অতীতে মানুষের নানাকীর্তির ধ্বংসাবশেষ ও বিভিন্ন নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব আবিষ্কার থেকে আমরা মোটমুটিভাবে মানুষের আবির্ভাবের একটা সমযকাল পাচ্ছি। আর সেই সময়টা হচ্ছে- খ্রিস্টপূর্ব এক কোটি বছর আগে (10th সহস্রাব্দ BC টেন্ থ মিলিয়ন বি.সি.)। এ বিষয়ে বাইবেলে যে তথ্য পাওয়া যায়, তাকে কিছুতেই বিজ্ঞানের সত্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে বিবেচনা করতে পারি না। বাইবেলের আদিপুস্তকে (টেক্সট অব জেনেসিস বা আদি পুস্তক) আদি মানুষের আবির্ভাবের অর্থাৎ আদম সৃষ্টির সময় যে বংশ-তালিকা দেয়া হয়েছে, সে সময়টা হচ্ছে মোটমুটিভাবে খ্রিস্টপূর্ব সাইত্রিশ শতাব্দীর। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের হয়তো এ বিষয়ে আরো তথ্য আবিষ্কার ও সরবরাহ করতে সক্ষম হবে এবং তার মাধ্যমে আমরা অনায়াসেই মানুষের আবির্ভাবের প্রশ্নে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সময়কালের তুলনায় অনেক সঠিক সময় তথা তারিখ পেয়ে যাব। কিন্তু এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে, ভবিষ্যতের সেই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হবে আধুনিক বিজ্ঞানের ইস্পাতকঠিন সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।”
অন্যদিকে তিনি বলেন,
“এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বাইবেলের সুসমাচার-পুস্তকের সূচনাপর্বের পর্যালোচনায় আমাকে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। প্রথম পৃষ্ঠাতেই রয়েছে যিশু'র বংশ-লতিকা কিন্তু এ বিষয়ে মথি-লিখিত সুসমাচারের বক্তব্য স্পষ্টভাবে লুক-রচিত সুসমাচারের যে তথ্য, তা আধুনিক তথ্য-জ্ঞানের সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ। অবশ্য, বাইবেলের বক্তব্যের মধ্যে এই যে পারস্পরিক বৈপরীত্য, এই যে অবস্তবতা ও অসঙ্গতি, তা কিন্তু স্রষ্টার উপর আমার বিশ্বাসকে কখনো চিড় ধরাতে পারেনি। বরং আমার মনে হয়েছে বাইবেলের এই অসঙ্গতির জন্য মানুষই দায়ী। প্রকৃতপক্ষে, আর কারোপক্ষেই বলার উপায় নেই, বাইবেলের বাণীর প্রাথমিক বা আদিরূপ কি ছিল! কে জানে, সুদূর অতীতে কে কিভাবে বাইবেল সম্পাদনা করে গেছেন। আর কতোজন যে ইচ্ছাকৃতভাবে এর উপর কলম চালিয়ে গেছেন, কে তা বলতে পারে? এভাবে কতোজন যে নিজ ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় বাইবেলকে তার বর্তমান আকার দিয়ে গেছেন, তার খোঁজ কে দেবে? কিন্তু তাঁরা যাঁরাই হোন, তাঁরা কি কোনোদিন ভেবেছিলেন যে, এমন একদিন আসবে, যেদিন বিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত সত্যের নিরিখে বাইবেলের ওইসব বৈপরিত্য ও অসঙ্গতি প্রকট হয়ে ধরা পড়বে? মূলত, বাইবেলের এই ধরনের রদবদল সাধন করে সেকালে ওইসব ব্যক্তি ভালো কাজ করেছেন বলে যতোই মনে করে থাকুন-না-কেন, বিশেষজ্ঞ ও গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তাঁরা ছিলেন একদম অনবহিত। অথবা, নিজেদের এসব কাজের ত্রুটি-বিচ্যুতির প্রতি দৃষ্টি পড়লেও তাঁরা সম্ভবত দক্ষতার সাথে সবার চোখে ধুলো দিয়ে পার পেতে চেয়েছিলেন। বাইবেলের মথি ও যোহন-লিখিত সুসমাচারের আলোচনায় প্রমাণ তুলে ধরে দেখানোর চেষ্টা করা হবে যে, খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ ও জাঁদরেল ভাষ্যকারেরা পর্যন্ত এসব ত্রুটি-বিচ্যুতির ব্যাপারে কিভাবে শব্দের মারপ্যাঁচে আত্নপক্ষ সমর্থনের প্রয়াস পেয়ে গেছেন। পক্ষান্তরে, বাইবেলের কোনো বক্তব্যের অবাস্তবতা কিংবা স্ববিরোধিতা ধামাচাপা দিতে কেউ কেউ অতি বিস্ময়করভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়কে আরো বেশি “দুর্বোধ্য” করে তুলেছেন। এভাবে তাঁরা কখনো-সখনো বাইবেলের এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি ধামাচাপা দেয়ার কাজে ব্যর্থও হননি। বাইবেলের পুরাতন নিয়মের এতোসব মারাত্নক ত্রুটি-বিচ্যুতির ব্যাপারে এতো বিপুলসংখ্যক খ্রিস্টান কেন যে এরকম অনবহিত কিংবা কেন যে এত নীরব, তার ব্যাখা ও কারণ বোধ করি, পূর্বোক্ত বিষয় বৈ অন্য কিছু নয়। এ গ্রন্থের প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত ধর্মগ্রন্থের মর্ম উপলব্ধির ব্যাপারে বিজ্ঞানের ব্যতিক্রমধর্মী প্রয়োগ ও অবদানের বিশদ উদাহরণ রয়েছে। সেখানে দেখা যাবে, কোরআনে এমন কিছুসংখ্যক বাণী রয়েছে যেসব বাণীর অর্থ এতকাল ধারণা-শক্তির অতীত না হলেও সর্বসাধারণের কাছে অনেকটা দুর্বোধ্য হয়েই বিরাজ করছিল। কিন্তু এখন সেইসব দুর্বোধ্য বাণী আধুনিক সেক্যুলার-জ্ঞানের আলোকে ক্রমশ অধিকতর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই আবস্থায় ইসলাম সর্ম্পকে যখন বলা হয়, এই ধর্ম সমসময়ই বিজ্ঞানকে তার যমজ বোন হিসেবে বিবেচনা করে থাকে, তখন বিস্ময়ের কি থাকতে পারে? আবির্ভাব-পর্বের সূচনা থেকেই ইসলাম তার অনুসারীদের প্রতি বিজ্ঞানচর্চার নির্দেশ দিয়ে আসছে। এই নির্দেশ পালনের ফলে ইসলামী সভ্যতার সেই মহান যুগে মুসলমানেরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উৎকর্ষ সাধন হয়েছিল এবং তা থেকে রেনেসাঁর পূর্বপর্যন্ত পাশ্চাত্য জগৎ হয়েছিল বিশেষ লাভবান। এখন ধর্মগ্রন্থ ও বিজ্ঞানের সংঘাত জোরদার হওয়ার কারণে আধুনিক বিজ্ঞানের সন্ধানী-আলোকে নতুন করে কোরআনের বিভিন্ন বক্তব্যর উপরে দৃষ্টি নিপতিত হচেছ। আর এ কারণেই গড়ে উঠছে কোরআন ও বিজ্ঞানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের একটা সমঝোতা। ইতিপূর্বে কোনো কোনো বিষয়ে সম্যক-জ্ঞানের অভাব থাকায়, কোরআনের বিভিন্ন বক্তব্যকে অস্পষ্ট বা দুর্বোধ্য বলে আখ্যায়িত করা হত। বর্তমান আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান কোরআনের ঐসব বক্তব্যের ব্যাখ্যায় প্রভূত সহায়তা জুগিয়ে যাচ্ছে।”
[এই গ্রন্থ গ্রন্থিত হয়েছে ড. মরিস বুকাইলি বাইবেল কোরআন বিজ্ঞান গ্রন্থকে উপলক্ষ করে। এক্ষেত্রে, ড. মরিস বুকাইলির বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান বইতে যা পাঠনীয় রয়েছে, উপরন্ত আরও বেশিকিছু নতুন তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। ফলে, এই বইয়ের পাঠক বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান বইতে পঠনীয় পাঠসহ আরও বেশিকিছু নতুন তথ্য পাবেন। এই গ্রন্থকারের এই গ্রন্থনার উদ্দেশ্য- তিনি মনে করেন, ড. মরিস বুকাইলি এখন যদি তাঁর বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান বইটি লিখতেন, সম্ভবত তিনি এ সকল তথ্য সন্নিবেশিত করতেন। এমনকি আরও বেশিকিছু।]
বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান
মূলঃ ড. মরিস বুকাইলি
রূপান্তরঃ খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
**************************************
💠ড. মরিস বুকাইলি (১৯ জুলাই, ১৯২০- ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮[১]) একজন ফরাসি চিকিৎসাবিদ। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর রচিত বাইবেল, কোরআন ও বিজ্ঞান গ্রন্থটির কারণে তিনি বিখ্যাত। বইটি পৃথিবীর প্রায় সতেরোটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
🔴 অনুবাদ - ওসমান গনি
🔴 রূপান্তর - খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
**************************************
🔴 If the download does not work please use VPN


%20.jpg)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন