শিক্ষাই আলো



একটি তিক্ত উপলব্ধি

ঘটনাটি সত্যিই অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ভিডিওটি দেখে ভেতরে ভেতরে একটা ধাক্কা অনুভব করলাম। আমি জানতাম শ্রীলঙ্কানদের সাক্ষরতার হার বেশ উঁচুতে — ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী মোট ৯৩.২%, যার মধ্যে পুরুষ ৯৪% এবং মহিলা ৯২% (সূত্র: উইকিপিডিয়া)। এত উচ্চ সাক্ষরতার একটি জাতির এই পরিণতি দেখে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

ভিডিওটি দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল এক শ্রীলঙ্কান চলচ্চিত্র পরিচালকের কথা। শাহবাগে অনুষ্ঠিত এক চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। সে সময় আমি নিয়মিত বার্ষিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে অংশ নিতাম এবং সদস্যপদও ছিল আমার। সদস্য হওয়ার সুবাদে আয়োজকদের সঙ্গে একটু আলাদাভাবে মেলামেশার সুযোগ ছিল, আর সেই সুযোগেই ওই পরিচালকের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলতে পেরেছিলাম।

সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ব্যস্ততার মাঝে শুধু দুপুরের বিরতিটুকুতে একটু অবসর মিলত। সেই ফাঁকেই আমাদের আলাপ জমে উঠেছিল। তখন বিএনপির শাসনামল। এখনকার মতো রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা তখনও এতটা ভয়াবহ রূপ নেয়নি। যাক, সে প্রসঙ্গ থাক।

সেদিন আমি তাঁর কাছে জানতে চাইছিলাম — সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে আমাদের দুই দেশের মধ্যে ব্যবধানটা আসলে কোথায়। উত্তরে তিনি যা বললেন, তা শুনে আমি রীতিমতো থমকে গিয়েছিলাম।

তিনি বললেন —

"দেখো, আমরা আমাদের কাজ করি, রাজনীতিবিদরা তাঁদের কাজ করেন। তাঁরা আমাদের সাধারণ জীবনে নাক গলান না, আমরাও তাঁদের বিষয়ে অকারণ হস্তক্ষেপ করি না। আমাদের সমস্যা সমাধানের জন্যই তো তাঁদের নির্বাচিত করে পাঠিয়েছি — তাহলে আর বারবার পেছনে পড়ার কী দরকার? তাঁরা যথেষ্ট শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের যা নেই, সেটাই তাঁদের মধ্যে আছে — এ কারণেই তাঁদের বেছে নেওয়া হয়েছে।"

সেদিন কথাগুলো শুনে মনে একটু হোঁচট লেগেছিল এই ভেবে যে, চিন্তার গভীরতায় তাঁরা আমাদের চেয়ে কতটা এগিয়ে ছিলেন। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কটা তাঁরা কত স্বাভাবিকভাবেই বুঝতেন। অথচ আজ সেই দেশেরই এই দুর্দশা — ভাবতে বুকের ভেতর একটা মোচড় লাগে।

তাহলে মূল সমস্যাটা কোথায়?

এখানেই আসে শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি। শিক্ষা মানে কি শুধু অক্ষর চেনা, সার্টিফিকেট অর্জন কিংবা সাক্ষরতার হারের একটি চমকদার সংখ্যা? না। প্রকৃত শিক্ষা হলো সেই আলো, যা একজন মানুষকে শেখায় — কীভাবে ভাবতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে ভুল স্বীকার করতে হয় এবং কীভাবে অন্যের সঙ্গে সহাবস্থান করতে হয়। এই শিক্ষা যদি না থাকে, তাহলে উচ্চ সাক্ষরতার হারও একটি জাতিকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে না — শ্রীলঙ্কা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।

শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। একটি দেশের মানুষ যদি শিক্ষিত হয়েও দুর্নীতিকে স্বাভাবিক মনে করে, ক্ষমতার অপব্যবহারকে মেনে নেয়, কিংবা রাষ্ট্রের প্রতি নিজের কর্তব্য ভুলে যায় — তাহলে সেই শিক্ষা আসলে অসম্পূর্ণ। শিক্ষা কেবল ব্যক্তিকে দক্ষ করে তুললেই চলে না, তাকে সচেতন নাগরিকও করে তুলতে হয়।

এ ছাড়া, সমালোচনামূলক চিন্তার অভ্যাস গড়ে না উঠলে শিক্ষা বরং বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ তখন শিক্ষিত মানুষও গোষ্ঠীস্বার্থে অন্ধ হয়ে যায়, মিথ্যা তথ্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করে এবং নেতার মোহে পড়ে বিবেক হারিয়ে ফেলে।

যে সমাজে মানুষ পরস্পরকে সম্মান করতে শেখে না, ভিন্নমতকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে পারে না, একে অপরকে অবিশ্বাস করে, আতঙ্কে গুটিয়ে থাকে এবং সমস্যা সমাধানে জ্ঞান ও বিবেচনার বদলে পেশিশক্তির আশ্রয় নেয় — সেই সমাজের শিক্ষা আসলে কতটা অসম্পূর্ণ, তা-ই প্রকাশ পায়। এরকম পরিবেশে যত ডিগ্রিধারীই তৈরি হোক না কেন, পরিণতি শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার মতোই হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই শুধু বিদ্যালয় বাড়ালে, পাঠ্যবই ছাপালে বা পরীক্ষায় পাসের হার বাড়ালেই হয় না। দরকার এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করতে শেখায় এবং সর্বোপরি — মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

বলতে গেলে অনেক কিছুই বলা যায়, নানা সমাধানও আছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেসব বিস্তারিত বলার অনুকূল নয়।

পরিশেষে একটু ব্যক্তিগত কথা — সেই শ্রীলঙ্কান পরিচালক বিদায়ের সময় আমাকে একটি কয়েন উপহার দিয়েছিলেন। সেটি এখন আর আমার কাছে নেই — হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু তাঁর সেই কথাগুলো আজও মনের কোথাও গেঁথে আছে। হয়তো কয়েনটি হারিয়েছি, কিন্তু সেদিনের সেই উপলব্ধি এখনও বুকের ভেতর অটুট রয়ে গেছে।

ঋণের টাকায় ঘি খেয়ে কেমন আছে শ্রীলঙ্কা? - YouTube

শ্রীলংকা কিভাবে দেউলিয়া হল ? - YouTube

🇱🇰 Sri Lanka: How is an economic crisis affecting people? | The Stream

যে কারণে হঠাৎ ফতুর শ্রীলঙ্কা। আমাদের (বাংলাদেশের) ফুটানি ঠিক আছে তো?

প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট, সেনাপ্রধান, অর্থমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সবাই একই পরিবারের সদস্য

Can the dire economic crisis in Sri Lanka be solved? | Inside Story


শিক্ষার হার, মানব উন্নয়ন সূচক, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরী সকল ক্ষেত্রেই তাদের এগিয়ে যাওয়ার গতি ছিল ঈর্ষনীয়। শ্রীলঙ্কার বর্তমান অবস্থা কারও অজানা নেই। কেন এমন হলো? 

এই পটভূমিতে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ কি নিরাপদ আছে? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়েই জানা গেল, ঋণ গ্রহণের হার অবিশ্বাস্য রকমের বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। 

"ভুল করাটা যতটা না অপরাধ তার চেয়ে বড় অপরাধ ভুল বুঝতে না পারা, বুঝতে না পারলেও স্কিকার না করা।"

মোরা ঋণের টাকায় ঘি খাই; “তবু শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনা করিয়া লজ্জা দিবেন না” -

THE GREEN CHANNEL




মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ